
কানাইঘাটে প্রসূতির মর্মান্তিক মৃত্যু: ভুল চিকিৎসার অভিযোগের আড়ালে সামনে এলো স্থানান্তরে বিলম্বের তথ্য! সিলেটে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন চিকিৎসকরা, তবুও কেন হলো না দ্রুত স্থানান্তর?
সিলেটের কানাইঘাটে এক প্রসূতি নারীর মর্মান্তিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার অভিযোগ। তবে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে সামনে এসেছে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটে স্থানান্তরের পরামর্শ, রোগীর স্বজনদের সিদ্ধান্ত এবং স্থানান্তরে বিলম্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে পুরো ঘটনা নিয়ে নতুন করে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি ফরহাদ সাগর নামের এক ব্যক্তি ফেসবুক লাইভে এসে তাঁর বোনের মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসা অবহেলা ও অপচিকিৎসার অভিযোগ তোলেন। তাঁর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অভিযোগের পাশাপাশি ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।
প্রথম ক্লিনিক থেকেই জটিলতার বিষয়টি সামনে আসে
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, প্রসবের নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পর ওই প্রসূতি নারীকে প্রথমে সড়কের বাজার এলাকার একটি ক্লিনিকে নেওয়া হয়। সেখানে রোগীর শারীরিক অবস্থা ও জটিলতা বিবেচনায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ চিকিৎসা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে বলে জানা গেছে।
পরবর্তীতে তাঁকে কানাইঘাটের মা-মনি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনার পর চিকিৎসকরা রোগীকে দ্রুত সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সিলেটে নিতে অনীহা, রোগীর আকুতির অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, মা-মনি হাসপাতালে চিকিৎসকদের পরামর্শের পরও রোগীর সঙ্গে থাকা তাঁর ভাবি নাজমা বেগম তাঁকে সিলেটে নিতে রাজি হননি। এ সময় রোগী নিজেও উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটে নেওয়ার আকুতি জানিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
তবে এসব বক্তব্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বাধীনভাবে যাচাই করা বক্তব্য এখনো প্রয়োজন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও স্থানান্তরের পরামর্শ
পরবর্তীতে ওই প্রসূতি নারীকে কানাইঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানেও কর্তব্যরত চিকিৎসকরা রোগীর জটিল পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত সিলেটে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন বলে জানা গেছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, স্বজনদের পক্ষ থেকে স্থানান্তরে সম্মতি না দেওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঝুঁকির বিষয়টি উল্লেখ করে নাজমা বেগমের কাছ থেকে লিখিত দায়িত্বগ্রহণের বন্ড গ্রহণ করে।
যদি এই বন্ডের বিষয়টি নথিপত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়, তাহলে সেটি পুরো ঘটনার তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত সিলেটের পথে, কিন্তু বাঁচানো গেল না প্রাণ
পরবর্তীতে হাসপাতালে প্রসবসংক্রান্ত চিকিৎসা চলাকালে ওই প্রসূতি নারী অচেতন হয়ে পড়েন। পরিস্থিতির অবনতি হলে তাঁকে সিলেটে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে গোলাপগঞ্জ এলাকায় পৌঁছালে পথিমধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়।
একটি পরিবারের জন্য এটি অপূরণীয় ক্ষতি। একই সঙ্গে ঘটনাটি স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি রোগী স্থানান্তর এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।
এখন যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন
ঘটনাটি নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি—
১. মা-মনি হাসপাতালে রোগীর প্রকৃত শারীরিক অবস্থা কী ছিল এবং চিকিৎসকরা কী পরামর্শ দিয়েছিলেন?
২. উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত সিলেটে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকলে স্থানান্তরে বিলম্বের কারণ কী ছিল?
৩. কানাইঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না?
৪. লিখিত দায়িত্বগ্রহণের বন্ডে কী উল্লেখ ছিল এবং সেটি কার সিদ্ধান্তে নেওয়া হয়েছিল?
৫. রোগীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী? চিকিৎসা অবহেলা, রোগের জটিলতা, নাকি অন্য কোনো কারণ এর পেছনে দায়ী?
প্রয়োজন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত
একজন প্রসূতি নারীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পক্ষের অভিযোগ কিংবা অন্য পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করা সমীচীন নয়।
এ ঘটনায় মা-মনি হাসপাতাল, কানাইঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, রোগীর স্বজন এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে রোগীর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ময়নাতদন্তের নথি থাকলে সেগুলোও পর্যালোচনা করা জরুরি।
সচেতন মহলের দাবি, তদন্তের মাধ্যমে যদি কোনো চিকিৎসক, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা স্বজনের দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রশ্ন একটাই—একজন প্রসূতি মায়ের মৃত্যু কীভাবে হলো, কোথায় ছিল গাফিলতি, আর সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে কি তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হতো?
এই প্রশ্নগুলোর নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক উত্তরই পারে ঘটনার প্রকৃত চিত্র জনসম্মুখে তুলে ধরতে।
সাদমান সাকিব, কানাইঘাট 











