Dhaka ০২:৫২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
যুক্তরাজ্যে মোট বাংলাদেশিদের ৯০-৯৫% সিলেটি সিলেটি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫-৬ লাখ প্রিয় শায়খে লক্ষীপুরী হাফিজাহুল্লাহ এখন মোটামুটি সুস্থ আছেন এবং চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত জকিগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব মাসুক আহমদ সিলেটের জকিগঞ্জ থানা পুলিশের অভিযানে ৪০০০ পিস ইয়াবাসহ ০১ জন মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার। ৪০০ ছাড়াল কাঁচামরিচ, অনিয়ন্ত্রিত সবজি ও ডিমের দাম ‘তোমার মতো মেয়ে বিয়ের আগে পাওয়া দরকার ছিল’ বলা সেই শিক্ষক বহিষ্কার ধর্ষণের অভিযোগে বাবার মিথ্যা স্বাক্ষীর বিরুদ্ধে ছেলের অবস্থান। ব্রাজিল জাতীয় দলের সঙ্গে নিজের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘোষণা দিয়েছেন নেইমার জুনিয়র কানাইঘাট পেল নতুন ইউএনও, যোগ দিয়েছেন সুমাইয়া ঢাকা মহানগরে প্রতি ঘন্টায় “১টি তালাক” !!

পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন উদ্ধার হওয়া এক লাখ ইয়াবা গায়েব, বহনকারীকে ছেড়ে দেওয়া হয় ওসির নির্দেশে

  • প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেটের সময়: ০১:২২:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
  • ২০১ সময় দেখুন

কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম নগরে আসার পথে পুলিশের এক সদস্যের কাছ থেকে এক লাখ ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করে নগরের বাকলিয়া থানা-পুলিশ। তবে এ ঘটনায় মামলা না করে হাতিয়ে নেওয়া হয় উদ্ধার করা ইয়াবা বড়ি। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নির্দেশে ছেড়ে দেওয়া হয় বহনকারীকে। ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন ওসি।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের করা এক তদন্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এ প্রতিবেদন গত ২৯ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ ঘটনার প্রায় ছয় মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে মামলার সুপারিশ করা হয়। আত্মসাৎ হওয়া ইয়াবা বড়িও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি গ্রেপ্তার হননি ইয়াবা পাচারে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য।

ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনাটি ঘটে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর। যাঁর কাছ থেকে ইয়াবা উদ্ধার হয়, তাঁর সঙ্গে আরেক ব্যক্তির কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এরপর অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরীকে প্রধান করে পুলিশের ওই তদন্ত কমিটি করা হয়।

ঘটনার সময় বাকলিয়া থানার ওসির দায়িত্বে ছিলেন আফতাব উদ্দিন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার ওসি। তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর আট পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হলেও ওসি আফতাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্যরা হলেন উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আল-আমিন সরকার, এসআই মো. আমির হোসেন, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সাইফুল আলম, এএসআই জিয়াউর রহমান, এএসআই সাদ্দাম হোসেন, এএসআই এনামুল হক, কনস্টেবল রাশেদুল হাসান ও কনস্টেবল উম্মে হাবিবা স্বপ্না।

ইয়াবার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি আত্মসাৎ করিনি। ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম।

আফতাব উদ্দিন, তৎকালীন ওসি, বাকলিয়া থানা

যে পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে ইয়াবা উদ্ধার করার অভিযোগ উঠেছে, তাঁর নাম ইমতিয়াজ হোসেন। কক্সবাজার জেলা আদালতের এক বিচারকের গানম্যান ছিলেন তিনি। ঘটনার পর তাঁকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সর্বশেষ এ ঘটনায় ৯ জুন বাকলিয়া থানার পরিদর্শকের (তদন্ত) দায়িত্বে থাকা তানভীর আহমেদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  প্রিয় শায়খে লক্ষীপুরী হাফিজাহুল্লাহ এখন মোটামুটি সুস্থ আছেন এবং চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এ ঘটনার প্রায় ছয় মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে মামলার সুপারিশ করা হয়। আত্মসাৎ হওয়া ইয়াবা বড়িও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি গ্রেপ্তার হননি ইয়াবা পাচারে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য।

পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে ওসিকে অভিযুক্ত করে বলা হয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৪৬ ধারার বিধান অনুযায়ী মাদকদ্রব্য–সংক্রান্ত অপরাধগুলো আমলযোগ্য অপরাধ। তা সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তিকে মাদকসহ আটকের পর ওসি মামলা না করে পিআরবির (বাংলাদেশ পুলিশ প্রবিধান) ২৪৪ বিধি লঙ্ঘন করেছেন। একই সঙ্গে পুলিশ আইনের ২৯ ধারার অপরাধ করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিন ইয়াবা গায়েবের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেননি। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও সংরক্ষণ করেননি। অভিযানে থাকলেও বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ ওসির নির্দেশে ইয়াবা বহনকারীকে ছেড়ে দেন। পরিদর্শক তানভীরের সঙ্গে অভিযানে ছিলেন বাকলিয়া থানার আরও আট পুলিশ সদস্য। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও ফৌজদারি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং নিয়মিত মামলার সুপারিশ করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুস সাত্তার প্রথম আলোকে বলেন, মাদক উদ্ধারের অপরাধটি আমলযোগ্য হলেও সংশ্লিষ্ট থানার ওসি ইয়াবাসহ আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দিয়ে অপরাধ করেছেন। ফৌজদারি মামলা করে ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা, আলামত উদ্ধার হওয়া সত্ত্বেও কেন এফআইআর (এজাহার) ও জব্দ তালিকা প্রস্তুত হয়নি, তা তদন্ত করা উচিত। মাদক গোপনে হস্তান্তর করে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যকে কোনো বেআইনি সুবিধা দেওয়া হয়েছে কি না, এসব বিষয়ও জানতে হবে।

যেভাবে আত্মসাৎ করা হয় ইয়াবা

ছয় পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কনস্টেবল ইমতিয়াজ কক্সবাজারের মো. মোশাররফ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে এক লাখ ইয়াবাভর্তি একটি লাগেজ ঢাকাগামী একটি বাসে করে নিয়ে আসেন। এর বিনিময়ে তাঁকে ৮০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা। দেশ ট্রাভেলসের (ঢাকা মেট্রো ব ১৫-১৬৪২) বাসটি কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতু পার হওয়ার পর বাকলিয়া থানার এএসআই সাদ্দাম হোসেন ও সাদাপোশাকে থাকা পুলিশের এক সোর্স বাসটিতে ওঠেন। তখন তাঁরা বাসে ঘুমন্ত যাত্রী ইমতিয়াজকে জাগিয়ে তোলেন। ওই সময় তিনি নিজেকে পুলিশ পরিচয় দেন এবং তাঁর পরিচয়পত্র দেখান। এরপর ইমতিয়াজকে বাস থেকে নামিয়ে পুলিশ বক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর দুই পুলিশ সদস্য এসে বাস থেকে ইমতিয়াজের লাগেজটি পুলিশ বক্সে নিয়ে যান। ওই সময় বাসের সুপারভাইজার মো. মিজান পুলিশ বক্সে গেলেও এসআই আমির হোসেন তাঁকে বাস নিয়ে চলে যেতে বলেন। তখন চালক মো. সুলতান গাড়ি নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে চলে যান।

আরও পড়ুনঃ  সড়ক দুর্ঘটনায় আহত জকিগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব মাসুক আহমদ

প্রতিবেদনে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ সদস্য ইমতিয়াজ বলেন, পুলিশ বক্সে সাদাপোশাকে বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ, এসআই আল–আমিন সরকার দাঁড়ানো অবস্থায় ছিলেন। পুলিশ বক্সের ভেতর ইমতিয়াজের লাগেজটি খোলেন সাদাপোশাকে থাকা পুলিশের সোর্স। লাগেজ সামান্য খুলে ভেতরে ইয়াবা দেখতে পেয়ে আবার লাগেজের মুখ লাগিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় ইমতিয়াজ তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। পুলিশ সদস্যরা নিজেদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেন। পরে ইমতিয়াজের সামনে লাগেজের ভেতর থেকে ইয়াবার প্যাকেটগুলো খোলা হয়। প্রতি প্যাকেটে ১০ হাজার করে ১ লাখ ইয়াবা ছিল।

পরে পুলিশ সদস্যরা সব ইয়াবা নিজেদের দখলে নিয়ে কাপড়চোপড়সহ লাগেজটি ইমতিয়াজকে দিয়ে দেন। তিনি পুলিশ বক্স থেকে বেরিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা করে নগরের অলংকার মোড় বাসস্ট্যান্ডে যান। সেখান থেকে কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতে চলে যান।

বাকলিয়া থানার ওসি আফতাব উদ্দিনের নির্দেশেই ইয়াবা বড়িগুলো ছেড়ে দেওয়া হয় বলে উল্লেখ করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে। জানতে চাইলে আফতাব উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইয়াবার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি আত্মসাৎ করিনি। ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম।’

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ, এসআই আল–আমিন সরকার, আমির হোসেন, এএসআই সাদ্দাম হোসেন, কনস্টেবল ইমতিয়াজের কাছ থেকে এক লাখ ইয়াবা উদ্ধার করে আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে ছেড়ে দেওয়া এবং আত্মসাৎ করে অপরাধ করেছেন। এ ছাড়া এএসআই সাইফুল আলম, জিয়াউর রহমান, এনামুল হক, কনস্টেবল রাশেদুল, উম্মে হাবিবা স্বপ্না পুলিশ সদস্যদের অবৈধ কার্যকলাপে সহযোগিতা এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সরাসরি মিথ্যাচার করে অপরাধ করেছেন।

আরও পড়ুনঃ  প্রিয় শায়খে লক্ষীপুরী হাফিজাহুল্লাহ এখন মোটামুটি সুস্থ আছেন এবং চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে এ ঘটনায় নিয়মিত মামলা দায়ের এবং তদন্তের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা ইয়াবা উদ্ধার, ইয়াবা সরবরাহকারী মোশাররফকে গ্রেপ্তার, তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের সঙ্গে থাকা সাধারণ চেকারদের নাম-ঠিকানা উদ্‌ঘাটন করতে সুপারিশ করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ইয়াবাসহ পুলিশ সদস্যকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় আটজনকে সাময়িক বরখাস্তের সুপারিশ করা হয়েছিল। পরে তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও ফৌজদারি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং নিয়মিত মামলার সুপারিশও করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে। এ ছাড়া বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসি ও পরিদর্শক তদন্তকে সাময়িক বরখাস্তের সুপারিশ করা হয় পুলিশ সদর দপ্তরে। এরপর ৯ জুন বাকলিয়া থানার পরিদর্শক তদন্ত তানভীর আহমেদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

এদিকে তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাকলিয়া থানার আট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। এটির তদন্ত করছেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (পশ্চিম) আবদুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ সাদী। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আটজনের বিরুদ্ধে এখনো তদন্ত চলছে।’

উল্লেখ্য, কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের কমিশনার কিংবা পুলিশ সুপার বরখাস্ত করতে পারেন। পরিদর্শককে বরখাস্ত করেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি)।

আত্মসাৎ করা এক লাখ ইয়াবা উদ্ধার না হওয়া এবং নিয়মিত মামলা না করার বিষয়ে জানতে চাইলে সদ্য যোগ দেওয়া নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইয়াবা গায়েবে এত দিন কেন নিয়মিত মামলা হয়নি, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান জিরো টলারেন্স।

Tag :

যুক্তরাজ্যে মোট বাংলাদেশিদের ৯০-৯৫% সিলেটি সিলেটি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫-৬ লাখ

পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন উদ্ধার হওয়া এক লাখ ইয়াবা গায়েব, বহনকারীকে ছেড়ে দেওয়া হয় ওসির নির্দেশে

আপডেটের সময়: ০১:২২:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম নগরে আসার পথে পুলিশের এক সদস্যের কাছ থেকে এক লাখ ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করে নগরের বাকলিয়া থানা-পুলিশ। তবে এ ঘটনায় মামলা না করে হাতিয়ে নেওয়া হয় উদ্ধার করা ইয়াবা বড়ি। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নির্দেশে ছেড়ে দেওয়া হয় বহনকারীকে। ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন ওসি।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের করা এক তদন্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এ প্রতিবেদন গত ২৯ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ ঘটনার প্রায় ছয় মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে মামলার সুপারিশ করা হয়। আত্মসাৎ হওয়া ইয়াবা বড়িও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি গ্রেপ্তার হননি ইয়াবা পাচারে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য।

ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনাটি ঘটে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর। যাঁর কাছ থেকে ইয়াবা উদ্ধার হয়, তাঁর সঙ্গে আরেক ব্যক্তির কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এরপর অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরীকে প্রধান করে পুলিশের ওই তদন্ত কমিটি করা হয়।

ঘটনার সময় বাকলিয়া থানার ওসির দায়িত্বে ছিলেন আফতাব উদ্দিন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার ওসি। তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর আট পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হলেও ওসি আফতাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্যরা হলেন উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আল-আমিন সরকার, এসআই মো. আমির হোসেন, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সাইফুল আলম, এএসআই জিয়াউর রহমান, এএসআই সাদ্দাম হোসেন, এএসআই এনামুল হক, কনস্টেবল রাশেদুল হাসান ও কনস্টেবল উম্মে হাবিবা স্বপ্না।

ইয়াবার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি আত্মসাৎ করিনি। ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম।

আফতাব উদ্দিন, তৎকালীন ওসি, বাকলিয়া থানা

যে পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে ইয়াবা উদ্ধার করার অভিযোগ উঠেছে, তাঁর নাম ইমতিয়াজ হোসেন। কক্সবাজার জেলা আদালতের এক বিচারকের গানম্যান ছিলেন তিনি। ঘটনার পর তাঁকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সর্বশেষ এ ঘটনায় ৯ জুন বাকলিয়া থানার পরিদর্শকের (তদন্ত) দায়িত্বে থাকা তানভীর আহমেদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  সড়ক দুর্ঘটনায় আহত জকিগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব মাসুক আহমদ

এ ঘটনার প্রায় ছয় মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে মামলার সুপারিশ করা হয়। আত্মসাৎ হওয়া ইয়াবা বড়িও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি গ্রেপ্তার হননি ইয়াবা পাচারে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য।

পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে ওসিকে অভিযুক্ত করে বলা হয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৪৬ ধারার বিধান অনুযায়ী মাদকদ্রব্য–সংক্রান্ত অপরাধগুলো আমলযোগ্য অপরাধ। তা সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তিকে মাদকসহ আটকের পর ওসি মামলা না করে পিআরবির (বাংলাদেশ পুলিশ প্রবিধান) ২৪৪ বিধি লঙ্ঘন করেছেন। একই সঙ্গে পুলিশ আইনের ২৯ ধারার অপরাধ করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিন ইয়াবা গায়েবের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেননি। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও সংরক্ষণ করেননি। অভিযানে থাকলেও বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ ওসির নির্দেশে ইয়াবা বহনকারীকে ছেড়ে দেন। পরিদর্শক তানভীরের সঙ্গে অভিযানে ছিলেন বাকলিয়া থানার আরও আট পুলিশ সদস্য। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও ফৌজদারি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং নিয়মিত মামলার সুপারিশ করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুস সাত্তার প্রথম আলোকে বলেন, মাদক উদ্ধারের অপরাধটি আমলযোগ্য হলেও সংশ্লিষ্ট থানার ওসি ইয়াবাসহ আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দিয়ে অপরাধ করেছেন। ফৌজদারি মামলা করে ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা, আলামত উদ্ধার হওয়া সত্ত্বেও কেন এফআইআর (এজাহার) ও জব্দ তালিকা প্রস্তুত হয়নি, তা তদন্ত করা উচিত। মাদক গোপনে হস্তান্তর করে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যকে কোনো বেআইনি সুবিধা দেওয়া হয়েছে কি না, এসব বিষয়ও জানতে হবে।

যেভাবে আত্মসাৎ করা হয় ইয়াবা

ছয় পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কনস্টেবল ইমতিয়াজ কক্সবাজারের মো. মোশাররফ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে এক লাখ ইয়াবাভর্তি একটি লাগেজ ঢাকাগামী একটি বাসে করে নিয়ে আসেন। এর বিনিময়ে তাঁকে ৮০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা। দেশ ট্রাভেলসের (ঢাকা মেট্রো ব ১৫-১৬৪২) বাসটি কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতু পার হওয়ার পর বাকলিয়া থানার এএসআই সাদ্দাম হোসেন ও সাদাপোশাকে থাকা পুলিশের এক সোর্স বাসটিতে ওঠেন। তখন তাঁরা বাসে ঘুমন্ত যাত্রী ইমতিয়াজকে জাগিয়ে তোলেন। ওই সময় তিনি নিজেকে পুলিশ পরিচয় দেন এবং তাঁর পরিচয়পত্র দেখান। এরপর ইমতিয়াজকে বাস থেকে নামিয়ে পুলিশ বক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর দুই পুলিশ সদস্য এসে বাস থেকে ইমতিয়াজের লাগেজটি পুলিশ বক্সে নিয়ে যান। ওই সময় বাসের সুপারভাইজার মো. মিজান পুলিশ বক্সে গেলেও এসআই আমির হোসেন তাঁকে বাস নিয়ে চলে যেতে বলেন। তখন চালক মো. সুলতান গাড়ি নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে চলে যান।

আরও পড়ুনঃ  প্রিয় শায়খে লক্ষীপুরী হাফিজাহুল্লাহ এখন মোটামুটি সুস্থ আছেন এবং চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ সদস্য ইমতিয়াজ বলেন, পুলিশ বক্সে সাদাপোশাকে বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ, এসআই আল–আমিন সরকার দাঁড়ানো অবস্থায় ছিলেন। পুলিশ বক্সের ভেতর ইমতিয়াজের লাগেজটি খোলেন সাদাপোশাকে থাকা পুলিশের সোর্স। লাগেজ সামান্য খুলে ভেতরে ইয়াবা দেখতে পেয়ে আবার লাগেজের মুখ লাগিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় ইমতিয়াজ তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। পুলিশ সদস্যরা নিজেদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেন। পরে ইমতিয়াজের সামনে লাগেজের ভেতর থেকে ইয়াবার প্যাকেটগুলো খোলা হয়। প্রতি প্যাকেটে ১০ হাজার করে ১ লাখ ইয়াবা ছিল।

পরে পুলিশ সদস্যরা সব ইয়াবা নিজেদের দখলে নিয়ে কাপড়চোপড়সহ লাগেজটি ইমতিয়াজকে দিয়ে দেন। তিনি পুলিশ বক্স থেকে বেরিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা করে নগরের অলংকার মোড় বাসস্ট্যান্ডে যান। সেখান থেকে কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতে চলে যান।

বাকলিয়া থানার ওসি আফতাব উদ্দিনের নির্দেশেই ইয়াবা বড়িগুলো ছেড়ে দেওয়া হয় বলে উল্লেখ করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে। জানতে চাইলে আফতাব উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইয়াবার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি আত্মসাৎ করিনি। ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম।’

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ, এসআই আল–আমিন সরকার, আমির হোসেন, এএসআই সাদ্দাম হোসেন, কনস্টেবল ইমতিয়াজের কাছ থেকে এক লাখ ইয়াবা উদ্ধার করে আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে ছেড়ে দেওয়া এবং আত্মসাৎ করে অপরাধ করেছেন। এ ছাড়া এএসআই সাইফুল আলম, জিয়াউর রহমান, এনামুল হক, কনস্টেবল রাশেদুল, উম্মে হাবিবা স্বপ্না পুলিশ সদস্যদের অবৈধ কার্যকলাপে সহযোগিতা এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সরাসরি মিথ্যাচার করে অপরাধ করেছেন।

আরও পড়ুনঃ  সড়ক দুর্ঘটনায় আহত জকিগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব মাসুক আহমদ

তদন্ত প্রতিবেদনে এ ঘটনায় নিয়মিত মামলা দায়ের এবং তদন্তের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা ইয়াবা উদ্ধার, ইয়াবা সরবরাহকারী মোশাররফকে গ্রেপ্তার, তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের সঙ্গে থাকা সাধারণ চেকারদের নাম-ঠিকানা উদ্‌ঘাটন করতে সুপারিশ করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ইয়াবাসহ পুলিশ সদস্যকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় আটজনকে সাময়িক বরখাস্তের সুপারিশ করা হয়েছিল। পরে তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও ফৌজদারি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং নিয়মিত মামলার সুপারিশও করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে। এ ছাড়া বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসি ও পরিদর্শক তদন্তকে সাময়িক বরখাস্তের সুপারিশ করা হয় পুলিশ সদর দপ্তরে। এরপর ৯ জুন বাকলিয়া থানার পরিদর্শক তদন্ত তানভীর আহমেদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

এদিকে তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাকলিয়া থানার আট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। এটির তদন্ত করছেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (পশ্চিম) আবদুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ সাদী। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আটজনের বিরুদ্ধে এখনো তদন্ত চলছে।’

উল্লেখ্য, কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের কমিশনার কিংবা পুলিশ সুপার বরখাস্ত করতে পারেন। পরিদর্শককে বরখাস্ত করেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি)।

আত্মসাৎ করা এক লাখ ইয়াবা উদ্ধার না হওয়া এবং নিয়মিত মামলা না করার বিষয়ে জানতে চাইলে সদ্য যোগ দেওয়া নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইয়াবা গায়েবে এত দিন কেন নিয়মিত মামলা হয়নি, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান জিরো টলারেন্স।